পেশা যখন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ

স্বদেশ জার্নাল → প্রকাশ : 13 Jul 2022, 11:44:31 PM

image06

বাংলাদেশের বিকাশমান খাতের মধ্যে অন্যতম হলো ওষুধ শিল্প। বর্তমানে দেশে ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশের বেশি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে সরকারি তালিকাভুক্ত ৮৫০টি ছোট-বড় ওষুধ কারখানা ও ২৬৯টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে আসছে। দিন দিন বাড়ছে এ শিল্পের প্রসার। প্রয়োজন হচ্ছে জনশক্তির। এ শিল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছেন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ (এমআর), মেডিক্যাল প্রমোশন অফিসার (এমপিও), মেডিক্যাল ইনফরমেশন অফিসার (এমআইও) বা মেডিক্যাল সার্ভিসেস অফিসার (এমএসও)। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভরা ফার্মাসিউটিক্যাল/মেডিক্যাল কোম্পানি ও স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক পেশার মধ্যে যোগাযোগের মূল প্রতিনিধি। যে কোনো ফার্মাসিউটিক্যাল/মেডিক্যাল কোম্পানির পণ্য প্রচার ও বিক্রির কাজ করেন তারা। বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে বা ফার্মেসিতে ঘুরে ঘুরে তারা প্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিচিত করান। এ পেশা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সঙ্গে রয়েছে ভালো সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা। বিগত দুই দশকে বাংলাদেশে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়েছে। প্রায় সময় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এ খাতে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে থাকে।

 পেশা হিসেবে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ পেশায় যেহেতু শিক্ষিতরাই আসতে পারেন তাই সামাজিক মর্যাদাও বেশ উন্নত। আজকাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদের কাছে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ পেশার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের একমাত্র পেশা মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ, যেখানে চাকরি পেতে কোনো মামা-চাচা-খালুর প্রয়োজন হয় না। দুর্নীতি কিংবা স্বজনপ্রীতির কোনো সুযোগ নেই। কঠোর পরিশ্রম, মেধা, যোগ্যতা বলে এ পেশায় নিজেকে এগিয়ে নিতে হয়। রিপ্রেজেন্টেটিভরা চিকিৎসকদের কাছে পণ্যের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রতিষ্ঠানগুলো কী ওষুধ বানাচ্ছে, এর গুণাবলি কী, কোন রোগের নিরাময়ক প্রভৃতি তথ্য জানানো ও ওষুধের কার্যকারিতা তুলে ধরাই তাদের কাজ। আরেটি কাজ হলো, প্রায় সময় কোম্পানিগুলো নতুন ওষুধ বাজারে নিয়ে আসে। আগেরটির চেয়ে বাজারে আসা নতুন ওষুধটি মানের দিক দিয়ে কেন ভালো, এটিও চিকিৎসকদের বোঝাতে হয়। রিপ্রেজেন্টেটিভের আরও একটি কাজ হলো ওষুধের দোকান থেকে অর্ডার সংগ্রহ করা।

এমআরদের কাজ যোগদানের পরই সরাসরি কাজে পাঠানো হয় না। প্রথমে দুই থেকে তিন মাস মেয়াদি একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে হবে। নিয়োগকর্তা কোম্পানি নিজেরাই এ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। এখান থেকে প্রোডাক্ট সম্পর্কে ধারণা পেয়েই পরবর্তী সময় কাজ করতে হয়। পণ্য সচেতনতা বাড়ানো, পণ্যসংক্রান্ত পরামর্শ ও প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং গ্রাহকদের নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একজন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের মূল কাজ। এমআরদের কাজ হলো প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। প্রত্যেক প্রতিনিধির জন্য এলাকা নির্ধারিত থাকে। নির্দিষ্ট এলাকার ডাক্তারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাই তার কাজ। ডাক্তারদের চেম্বারে উপস্থিত হয়ে একজন এমআর-এমপিওর কাজ কী হবে তা আগেই অফিস থেকে ধারণা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী কোম্পানির ওষুধের গুণাগুণ ডাক্তারদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন তারা। অধিকাংশ মেডিক্যাল প্রতিনিধির কাজ প্রত্যেক সকালে হাসপাতালে উপস্থিত হওয়া। বিকালে ডক্টরস পয়েন্ট ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাক্তারদের চেম্বারে উপস্থিত হওয়া। সারাদিনের কাজ পরের দিন সকালে অফিসের সংশ্লিষ্ট বিভাগে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বুঝিয়ে দেওয়া।

এক সময় কেবল বিজ্ঞান বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরাই এ চাকরিতে আবেদন করতে পারতেন। এখন কোম্পানিগুলো অন্যান্য ডিসিপ্লিন বা বিভাগ থেকে আসা ব্যাচেলর বা মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের এ পেশায় কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ইদানীং বিজ্ঞান বিভাগ ছাড়াও বিবিএ, এমবিএ ডিগ্রিধারীরাও বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন এ পেশায়। ওষুধ উৎপাদন বা বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়োগে সাধারণত জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ পেশায় আগ্রহীরা পত্রিকায় উল্লিখিত শর্তগুলো মেনে আবেদন করতে পারেন।

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ পেশায় আবেদন প্রক্রিয়া অন্যান্য চাকরির মতোই। এ জন্য সম্প্রতি তোলা দুই কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সার্টিফিকেটের সত্যায়িত ফটোকপি আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার অবশ্যই আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। তা ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ বা সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করে থাকলেও বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে আবেদনপত্রে যোগ করতে পারেন। এতে চাকরিপ্রার্থীর ওপর নিয়োগকর্তার আস্থা তৈরি হতে পারে।

মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভদের প্রাথমিক বেতন ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে কাজের জন্য আলাদা খরচ দেওয়া হয়। লক্ষ্য পূরণের ওপর তারা বিশেষ সুবিধা পান। এ ছাড়া তাদের যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল দেওয়া হয়। বর্তমানে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানিতে রিপ্রেজেন্টেটিভদের বছরে দুই থেকে পাঁচটি পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়। এ পেশার একটি বিশেষ দিক হলো কাজের যোগ্যতার ওপর আয় নির্ভর করে। যিনি বেশি যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারবেন, তিনি তত বেশি বেতন পান।

 

 


Share

বিজ্ঞাপন
© All rights reserved © 2022 swadeshjournal.news Design & Developed by : alauddinsir