একটি_অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতি

স্বদেশ জার্নাল → প্রকাশ : 25 Nov 2022, 12:31:41 AM

image06

গোলাম কিবরিয়া খোন্দকার

 

অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছিলাম, ভদ্রলোক কিছু একটা বলতে চান। কিন্তু ঠিক সাহস পাচ্ছেন না। উনাকে আশ্বস্ত করতে সোজাসুজি তাকালাম। আশ্বস্ত হয়ে এগিয়ে এলেন। সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলেন, ' দাদা, আপনার বাড়ি কি ওপার বাংলা? '

আমার হ্যাঁ সূচক জবাব পেয়ে খুব খুশি হলেন!

এবার জিজ্ঞেস করলেন, ' দাদা, বাংলাদেশের কোথায় আপনার বাড়ি?'

'কুমিল্লা'

এবার যেন হাতে চাঁদ খুঁজে পেলেন। এবার আমার আরো কাছ ঘেঁষে বলা শুরু করলেন,

'জানেন, আমার বাড়িও কিন্তু কুমিল্লা। লাকসাম রেলওয়ে জংশনের কাছে ছিলো। আমি লাকসাম পাইলট হাইস্কুল ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়েছি।'

ভদ্রলোককে একটু থামিয়ে বললাম, 'আমি কিন্তু কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষক! '

আশ্চর্যজনক ঘটনাটি তখনই ঘটলো। তিনি আমার হাত চেপে ধরে বললেন,' স্যার, আপনি আমারও শিক্ষক! আমি ১৯৫৫-৫৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়েছি, আপনি সেই কলেজের শিক্ষক মানে আপনি আমারও শিক্ষক! '

আমি লজ্জা পেয়ে সবিনয়ে বললাম, 'সেটা কি কখনো হয়? সে সময়তো আমার জন্মও হয় নি। এটা আপনার বিনয়!'

ভদ্রলোকের মুখে যেন এবার খই ফুটছে।

ইন্ডিয়ান কাস্টমস সার্ভিস থেকে রিটায়ার্ড করে বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন। ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াকালীন তিনি রানীর বাজার এলাকায় কোন একটা বোর্ডিং বা মেসে ছিলেন। ৭০ এর দশকে পরিবারের সাথে ভারতে চলে আসেন।

এবার দেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করার পালা।

একেরপর এক আমাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছেন,

"রানীর বাজার এলাকাটা এখন কেমন?

সেখানে বাড়ি-ঘর কী খুব বেশি?

রানীর দীঘিটা কী এখনো আছে?

বিকালে টাউন হলে মানুষজন কেমন ভীড় করে?

লিবার্টি সিনেমা হলটি চালু আছে কী না?... ইত্যাদি ইত্যাদি "

আমি ধৈর্য ধরে একে একে উত্তর দিচ্ছিলাম আর তাঁর চোখের ঝলকানিতে তাঁর সোনালী অতীত দেখছিলাম! মানুষটা সম্মোহিতের মতো আমার কথা শুনছিল আর তাঁর কৈশোর-যৌবনের স্মৃতির সাথে মিলিয়ে নিচ্ছিল হয়তো! আমি তাঁকে তাঁর নিজ জন্মভূমি ভ্রমণে আসার আমন্ত্রণ জানাই এবং আমার ভিজিটিং কার্ড দিই।

লিবার্টি সিনেমা হলের প্রসঙ্গটি এলেই তিনি নড়ে চড়ে উঠলেন আর আমাকে শোনালেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ঐতিহ্য ও তৎকালীন শিক্ষকদের সম্মান ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের কথা! এই গল্প বিভিন্ন প্লাটফর্মে বিভিন্ন সময় করেছি। আজ আপনাদের জন্য সেটি শেয়ার করছি।

শুনুন ঐ ভদ্রলোকের ( ভদ্রলোকের নাম মনে নেই) মুখে...

"আমাদের সময় অধ্যক্ষ ছিলেন ড. আখতার হামিদ খান। বাবু নির্মল দত্ত স্যার আমাদেরকে ইংরেজি পড়াতেন। খুব ডাকসাইটে প্রফেসর ছিলেন। কুমিল্লার মানুষ তাঁকে খুব সম্মান ও সমীহ করতো। অবশ্য তখন ভিক্টোরিয়া কলেজের সকল শিক্ষকই সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সম্মানের পাত্র ছিলেন!

বর্ষাকালের এক বিকালবেলা। একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাবু নির্মল দত্ত ভিক্টোরিয়া কলেজ (বর্তমান উচ্চমাধ্যমিক শাখা) থেকে বেরিয়ে কান্দিরপাড় লিবার্টি চত্বর পার হচ্ছিলেন। পরনে ধবধবে সাদা চোস্ত পাঞ্জাবি ও ধুতি। তৎকালীন কুমিল্লা জেলায় জেলা প্রধান হিসেবে কর্মরত ..... * অফিসারের সরকারি গাড়িটি লিবার্টি মোড় পার হচ্ছিল। গাড়ি ঘোরার সময় চাকার ঘর্ষণজাত পানির চিটা গিয়ে পড়লো বাবু নির্মল দত্ত স্যারের ধুতিতে।

নির্মল দত্ত স্যার রাগে অগ্নশর্মা হয়ে চিৎকার করলেন, '.....ot!'

কয়েকফুট দূরে গিয়ে গাড়িটি থেমে গেলো। একজন ....* অফিসার নেমে এলেন।

বাবু'র সামনে এসে বললেন,

'What did you say?

Do you know who I am?

I am the (....*) officer of this District!

বাবু নির্মল দত্ত... * অফিসারের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কন্ঠে বললেন,

" So what?

I'm Nirmal Datta, maker of so so.....*(officer) like you!"

.*..অফিসার আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে গাড়িতে চড়ে স্টেশন ত্যাগ করলেন।"

[* সঙ্গত কারণে অফিসারের Specific Designation উল্লেখ করলাম না]

ঘটনাস্থলঃ #শংকর_নেত্রালয়'র ক্যান্টিন, কলকাতা, ভারত

সময় কালঃ ডিসেম্বর ২০১৫

#লেখক

গোলাম কিবরিয়া খোন্দকার

২৭তম বিসিএস(সাধারণ শিক্ষা)

১৯৯৪-৯৫ সেশনের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী ও

সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা (বর্তমান)

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা।

Email: khondakergolamkibria@gmail.com


Share

বিজ্ঞাপন
© All rights reserved © 2022 swadeshjournal.news Design & Developed by : alauddinsir