একটি_পুঁতিগন্ধময়_প্রেম_ও_আরেকটি_অমর_প্রেমের_কাহিনি

স্বদেশ জার্নাল → প্রকাশ : 28 Aug 2022, 10:57:07 PM

image06

মেহেরুন্নেছা 

প্রিয় পাঠক, সাকলায়েন আর পরীমনির সেই কারিশমাটিক জন্মদিন পালনের মুহূর্তটা আপনাদের মনে আছে? আমার মনে এখনো সেই দৃশ্যগুলো দারুণভাবে দাগ কেটে আছে; যেন পৃথিবীর সেরা এক মোহময় প্রেমের দৃশ্য ছিল সেটি! সত্যিই কি সেদিন সুন্দর সুন্দরের হাত ধরেছিল? কি অসাধারণ নৈপুণ্যে পরীমনি সাকলায়েনের বলিষ্ঠ হাতখানিতে তার মোলায়েম হাতের পরশ বুলিয়ে নিয়ে গেলো নীলরঙা কেক কেটে জন্মদিন উদযাপনে। সাকলায়েনের মায়াময় চোখদুটো ফুলের বনে একটা চপল প্রজাপতির নৃত্য দেখলো যেন। তদের প্রেম এতোটুকুতেই তুষ্ট রইলোনা। তৃষাতুর প্রেমিক-প্রেমিকার ঠোঁট পরস্পরকে ছুঁয়ে গেলো। ভালোবাসার এমন মোহমুগ্ধতা জাতি বহুদিন দেখেনি। নির্ঘাত একটা ডানাকাটা পরির সুঘ্রাণ সাকলায়েনকে মাতাল করে তুলেছিল।

আসলে পরীমনি কান্ডে সুদর্শন সাকলায়েন তদন্তের দায়িত্বে ছিল। অবশ্য পরে ঘটনাটি উল্টোস্রোতের মুখে পড়ে তিনশত ষাট ডিগ্রি ঘুরে যায়। কারণ ততক্ষণে সাকলায়েন পরীমনিতে বিভোর হয়ে পড়েছে এবং তার প্রেমের জলে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছে।

কিন্তু সাকলায়েন পরিমনির জীবনের নায়ক হতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু প্রতারক প্রেমিকের ন্যায় সাকলায়েন প্রেমের পুরো ব্যাপারটি বেমালুম চেপে যায়। ওদিকে বরাবরের মতন চপলা পরীমনি রাখঢাক ছাড়াই সব ব্যাপার-স্যাপার ফাঁস করে দেয়। এরপরেই জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটলো যখন সাকলায়েন-পরীমনির প্রেমময় জন্মদিন উদযাপনের ভিডিও প্রকাশ হয়ে পড়লো। সারাদেশের মানুষ নড়েচড়ে বসে। সেসময় কে ভিডিও ফাঁস করলো সেটি মূখ্য বিষয় ছিলনা, পাবলিকের অবাক চোখ তখন সাকলায়েন-পরীমনির ঠোঁট পরস্পরকে ছুঁয়ে যাওয়ার দৃশ্যতে নিবদ্ধ। যেন পুরো দেশ এমন আদিরসাত্মক ঘটনার তেলেসমাতি বহুদিন দেখেনি। কিন্তু হায় বিধিবাম! পুলিশ কর্মকর্তা সাকলায়েন পরীমনির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক পুরোপুরি অস্বীকার করে বসে। আর সাথে সাথে সাকলায়েনের কাপুরুষের কালিমায় সিক্ত হতে বেশিক্ষণ লাগেনি। তাদের সকল প্রেমের সমাপ্তি ঘটে অপ্রেমে পর্যবসিত হয়ে।

পাঠক, এবার তাহলে রাখি এমন পুঁতিগন্ধময় অপ্রেমের গল্পখানি।

চলুন, আমরা নিমেষে ঘুরে আসি আরেক কালজয়ী প্রেমকাব্যের ঐতিহাসিক ঘটনার ঘূর্ণিপাকে। হ্যাঁ! আমরা প্রবেশ করছি রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড ও ওয়ালিসের ভালোবাসার ভুবনভুলানো অধ্যায়ে।

সাকলায়েন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের মত প্রেমের রাজা হতে পারেনি। হতে পারেনি সে লাইলী-মজনু উপাখ্যানের মজনু কিংবা শিরি-ফরহাদ অমর প্রেমকাব্যের ফরহাদ। যুগে যুগে এইসব শিহরিত প্রেম কাহিনির গভীরতা সকল কালেই সভ্যতার কপালে তিলক এঁকে যায়, সাধারণের মাঝে সৃষ্টি করে প্রবল আকর্ষণ। সত্যি সেসময় এডওয়ার্ডের প্রেমকাহিনীর উত্তাপ পৃথিবীর সকল প্রেমকাহিনী ছাড়িয়ে গেল যেন!

তখনো রাজা হননি এডওয়ার্ড। তাদের প্রেম কাহিনির সবে শুরু। সময়টা ঠিক ১৯৩১ সালের ১০ জানুয়ারি। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের প্রাক্তন প্রেমিকা লেডি ফারনেস রাজার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ওয়ালিস সিম্পসনকে। তারপর থেকেই এডওয়ার্ড আর ওয়ালিস একই কক্ষপথে হাঁটা শুরু করেন। পুরো একটি সপ্তাহ তাঁরা কাটিয়ে দেন দুর্গে। স্পেন ও পর্তুগালের উপকূলে ক্রুজে ভ্রমণ করেন। এডওয়ার্ড বাকিংহাম প্যালেসে তাঁর মা রানী মেরির সঙ্গে সিম্পসন ওয়ালিসকে পরিচয় করিয়ে দেন। এভাবে দুজনের প্রেমের ডালপালা মেলতে শুরু করে।

এডওয়ার্ড প্রেমে এতই মজে গেলেন যে রাজকার্যে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু ওয়ালিস তখনো দ্বিতীয় স্বামীর ঘর করছেন।

ওয়ালিস খুব সুন্দরী ছিলেন এটা বলা যায় না; তবে তাঁর চেহারায় দীপ্তি ছিল। তিনি আকর্ষণীয় শারীরিক গঠনের অধিকারী ও ফ্যাশন সচেতন ছিলেন। অন্যদিকে সুদর্শন এডওয়ার্ডের সুবোধ বালকসুলভ ব্যক্তিত্ব, নীল চোখ এবং সোনালি চুল তাঁকে পরিণত করেছিল মেয়েদের কামনা বাসনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

প্রিন্স এডওয়ার্ডের বাবা ছিলেন রাজা পঞ্চম জর্জ। ১৯৩৬ সালে পঞ্চম জর্জ মারা গেলে রাজা হন এডওয়ার্ড। কিন্তু পরের দিনই প্রথা ভেঙ্গে সেন্ট জেমস প্যালেসের জানালায় দেখা যায় যুগল এডওয়ার্ড-ওয়ালিসকে। উল্লেখ্য ওয়ালিস তখনও আর্নস্ট সিম্পসনের স্ত্রী। বৃটিশ সংবাদ মাধ্যমগুলো রাজপরিবারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এ নিয়ে খবর প্রকাশ না করলেও বিদেশি পত্রপত্রিকাগুলো ফলাও করে এই রসাল খবর ছাপতে থাকে।

একেতো ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সূর্য তখন দিকচক্রবালে। অন্যদিকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের এডওয়ার্ডের প্রথাবিরোধী প্রেমকাহিনির জেরে একেবারে ভূলুণ্ঠিত অবস্থা। সরকার আর আদালত নড়েচড়ে বসলেও, ওয়ালিস এডওয়ার্ডের জন্য এক কাঙ্খিত সুখবর বয়ে আনলেন। ওয়ালিস তাঁর দ্বিতীয় স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছেন।

একটি সাধারণ মার্কিন পরিবারে জন্ম নেওয়া এবং দুইবার তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে এডওয়ার্ড বিয়ে করবে--- ব্রিটিশ সরকার, ইংল্যান্ডের চার্চ তাতে বাধ সাধলেন। স্বয়ং রাজা যেখানে চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান এবং চার্চ ডিভোর্স হয়ে যাওয়া ব্যক্তির পুনর্বিবাহ অনুমোদন করে না ; সেখানে এ বিয়ে সফল হওয়ার কোনো পথ রইলো না। এডওয়ার্ড ভাবলেন, তিনি সিম্পসনকে বিয়ে করবেন এবং সিম্পসনের রানীর মর্যাদা লাগবে না। কিন্তু তাঁর এই প্রস্তাবও ধোপে টিকলো না।

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইন এডওয়ার্ডকে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন----

১. ওয়ালিসকে বিয়ের চিন্তা বাদ দেওয়া।

২. প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করা।

৩. সিংহাসন ত্যাগ করা।

ইতোমধ্যে উদ্ভূত কঠিন পরিস্থিতির চাপ সহ্য করতে না পেরে ওয়ালিস তখন ফ্রান্সে পাড়ি দেন। আহত ও ব্যর্থ ওয়ালিস এডওয়ার্ডের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু প্রেমে ব্যাকুল এডওয়ার্ড জানতেন, এটা তাঁর প্রেমিকার মনের কথা নয়। অন্ধপ্রেমে আসক্ত ৪২ বছরের যুবরাজ এডওয়ার্ড বললেন,'যে মহিলাকে আমি ভালোবাসি তার সাহায্য ও সমর্থন ছাড়া রাজা হিসেবে কোনো দায়িত্ব আমি কাঁধে নিতে পারি না।'

সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে এডওয়ার্ড বল্ডউইনকে জানিয়ে দেন, তিনি তৃতীয় প্রস্তাবটিতে রাজি। অবশেষে ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বর, এডওয়ার্ড ব্রিটিশ পার্লামেন্টের 'আ্যবডিকেশন'(পদত্যাগ) জমা দেন। পরদিন তা অনুমোদন করা হয়।

প্রেমের সার্থকতার জন্য ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম মেয়াদি রাজার তালিকায় নাম লেখালেন প্রিন্স এডওয়ার্ড। তিনি সিংহাসনে ছিলেন মাত্র ৩২৬ দিন। তার পরেই তিনি তাঁর প্রেয়সীর কাছে ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে তাঁদের বিয়ে হয় ১৯৩৭ সালের ৩ জুন। তারপর প্যারিসে তাঁরা বসবাস শুরু করেন।

আর আমাদের সাকলায়েন কি করলো! চাকুরি এবং সংসার রক্ষার্থে পরীমনির সঙ্গে সব সম্পর্ক অস্বীকার করে বসলো। পরীমনি ফাঁস না করলে এবং সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও প্রকাশ না হলে আমজনতা তাদের ক্ষণকালের এই প্রেমের পর্ব কোনোদিনও জানতে পারতো না।

হায় প্রেম! কোথাও তুমি জিতে যাও আর কোথাও তুমি হেরে যাও!

রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড প্রমাণ করলেন, সিংহাসনের চেয়ে প্রেম বড়। আর পরীমনির পুলিশ প্রেমিক সাকলায়েন প্রমাণ করলো, প্রেমের চেয়ে চাকুরি বড়।

 


Share

বিজ্ঞাপন
© All rights reserved © 2022 swadeshjournal.news Design & Developed by : alauddinsir